রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:৩৬ অপরাহ্ন

অন্তর্বর্তী সরকারও ‘আটকে’ থাকতে চায় ১৯২৩ সালে

অনলাইন ডেস্ক:: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ১৯২৩ সালে প্রণীত অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট অনুসরণ করে রাষ্ট্রের ‘গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর’ তথ্য গোপন রাখার নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি এ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে উল্লেখ করে অফিসিয়াল তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখার এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তথ্য ফাঁসে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে চাকরি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে। এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা বলছেন, ১০০ বছরেরও বেশি সময়ের পুরোনো এ আইন কালাকানুন হিসেবেই পরিচিত। আইনটি বাস্তবায়নের জন্য দাপ্তরিকভাবে চিঠি দিয়ে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়ার নজির অতীতে কোথাও দেখা যায়নি।

গত ৩০ ডিসেম্বর জারি করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই আদেশে বলা হয়, ইদানীং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন শাখার গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর গোপনীয় তথ্যাদি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে, যা অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩-এর পরিপন্থি। এরূপ কার্যক্রমের ফলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। তাই জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়—এমন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর গোপনীয় তথ্যাদি ফাঁস বন্ধ করার বিষয়টি সব কর্মকর্তার মাধ্যমে মনিটরিং করা একান্ত প্রয়োজন।

আদেশে আরও বলা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর গোপনীয় তথ্যাদি ফাঁস বন্ধ করার বিষয়টি মনিটরিং করাসহ এরূপ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

উদ্বিগ্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অবাধ তথ্য প্রবাহের সময়ে এসে ১৯২৩ সালের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট বাস্তবায়ন বা তথ্য গোপনের পুরোনো সংস্কৃতি আবারও ফিরিয়ে আনতে অন্তর্বর্তী সরকারও ‘আটকে’ থাকতে চায় ১৯২৩ সালে। এ কারণেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা এমন কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে। দেশে এখন তথ্য অধিকার আইন রয়েছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক তৈরি করতে পারে—এমন তথ্য ছাড়া অন্য তথ্য প্রকাশে বাধা দেওয়া কোনোভাবে উচিত নয়। অথচ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক নির্বাহী হিসেবে সচিবের এমন নির্দেশনা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

তারা আরও বলেন, তথ্য ফাঁসের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তির আওতায় আনার কথাও বলা হয়েছে। আদেশ জারি হওয়ার পর এ নিয়ে সবার মধ্যে চিন্তা দেখা দিয়েছে। কারণ কার দপ্তর থেকে কখন চিঠি ফাঁস হয়, তা কেউ বলতে পারে না। দেখা যাচ্ছে, একেকটি নথির অনুলিপি বেশ কয়েকটি দপ্তরে যায়। ফলে কোথা থেকে ফাঁস হচ্ছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব হয় না।

এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে। এসব কাজের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে গণমাধ্যমগুলো সংবাদ প্রকাশের চেষ্টা করে। এসব সংবাদ রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য কখনোই হুমকি নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে সহায়ক। কারণ, গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে আমরা অনেক পদক্ষেপ নিতে পারি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নেও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন কাজে দেয়। সুতরাং অফিসিয়াল তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তথ্য জনগণের অধিকার। তারা গণমাধ্যমের মাধ্যমে তথ্য পাওয়ার অধিকার ভোগ করুক—এটাই আমরা চাই।

তিনি আরও বলেন, তথ্য ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি আইন অনুযায়ী শাস্তির আওতায় আনার যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা রীতিমতো ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করছে। এটা নিয়ে সবার মধ্যে ক্ষোভও দেখা দিয়েছে। অনেকে অপমান বোধ করছেন।

তথ্য গোপনের আদেশ জারি প্রসঙ্গে জানতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনিকে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। কথা বলতে চেয়ে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি উত্তর দেননি।

সংবিধান ও সংস্কার কমিশনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্ত জনপ্রশাসনবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমনকি সংবিধানের ধারা ৩৯-এর সঙ্গেও এটি সরাসরি সাংঘর্ষিক। এ ধারায় চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতার বিষয়ে বলা হয়েছে—(১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল। (২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং (খ) সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।

অন্যদিকে, জনপ্রশাসনবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার উন্মুক্ত তথ্য নীতি গ্রহণের কথা বিবেচনা করতে পারে। কারণ সরকারি তথ্য উন্মুক্ত করলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি পাবে এবং তা দুর্নীতি লাঘবে সহায়ক হবে। এজন্য তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট-১৯২৩ এবং সাক্ষ্য আইন-১৮৭২ প্রয়োজনীয় সংশোধন করে যুগোপযোগী করা যেতে পারে। সংবাদপত্র ও অন্যান্য মিডিয়ার নিরপেক্ষ, সত্যান্বেষী, বস্তুনিষ্ঠ, দায়িত্বশীল সংবাদ এবং মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য উৎসাহ দিতে হবে বলেও মতামত দেয় জনপ্রশাসন বিষয়ক সংস্কার কমিশন।

জানা যায়, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ১৯২৩ সালের ২ এপ্রিল ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ আইনটি প্রণয়ন করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ৩০ জুন ‘দ্য বাংলাদেশ ল’জ (রিভিশন অ্যান্ড ডিক্লারেশন) অ্যাক্টের দ্বিতীয় তপশিলে দুটি শব্দ পরিবর্তন করে সরকারি গোপনীয়তা সংক্রান্ত ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ আইনটি আত্তীকরণ করে বাংলাদেশ।

আইন বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন প্রণীত হওয়ার পর ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া শতবর্ষের পুরোনো অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের কার্যকারিতা আর নেই। কারণ, নতুন আইন সব সময়ই অগ্রাধিকার পাবে। তবু রাষ্ট্রযন্ত্র আইনটির অপব্যবহার করে আসছে। বিশেষ করে সাংবাদিকদের ওপরই এ আইনের অপব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়েছে।

তারা আরও বলেন, ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে শাসকদের বিবেচনায় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি রোধে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট করা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে প্রণীত দেশের সংবিধানের ৩৯ ধারায় মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও মানুষের জানার অধিকার নিশ্চিত করতে ব্রিটিশদের আইনটিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন আইন বিশ্লেষকরা।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ব্রিটিশরা এ উপমহাদেশ শাসনের সময় সারা বিশ্ব নানাভাবে যুদ্ধবিগ্রহে যুক্ত ছিল। তখন তারা তাদের উপনিবেশ টিকিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় অনেক বিষয় গোপন রাখার প্রয়োজন অনুভব করেছিল বলেই আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের সংবিধানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রদান এবং তথ্য অধিকার আইনে জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। অথচ অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে তথ্য গোপন রাখার সংস্কৃতি চালু আছে, যা সংবিধান ও তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে একেবারেই সাংঘর্ষিক।

শুধু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো গোপন রাখার বিধান রেখে অন্য ক্ষেত্রে যেন সবাই তথ্য পায়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার বলেও মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র এ আইনজীবী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com